.
.
-হ্যালো ম্যাডাম!
-হুমম বল কি খবর তোমার?
-আমার খবর আর কে নেয়!
-বাড়িতে মেহমান আসছিল তাই ফোন দিতে পারিনাই....একটু
ব্যস্ত ছিলাম। দুপুরে খাইছ?
-না।
-একদিন বলছি না আমার ফোনের জন্য বসে না থেকে খেয়ে নিবা?
-তোমার সাথে কথা না বললে আমার কিছু ভাল্লাগেনা।
-উফ তোমাকে নিয়া আর পারলাম না। সবসময় কি আর আমি থাকব?
-কেন বিয়ে নাকি তোমার
-হতেও পারে।মরেও যেতে পারি।তখন তুমি না খেয়ে থাকবে?
-এসব কোন ধরনের কথা?তোমার কিছু হলে আমি মরেই যাব.....শোনো যত কাজই থাকুক
তুমি প্রতি বেলা আমাকে ফোন দেবে তারপরই আমি খাব।আর কিছু জানতে চাইনা আমি।
-সারাজীবন শুনছি খাওয়ার ব্যাপারে মেয়েরা ছেলেদের জন্য অপেক্ষা করে,শুধু আমার বেলায়ই দেখি উল্টা!
-এবার বোঝো কত ভালো প্রেমিক পাইছ তুমি!
-হইছে এত নিজের গুন গাইতে হবেনা। এখন যান খেয়ে আসেন।আমি রাখলাম।
.
কথা হচ্ছিল আয়েশার সাথে। মেয়েটাকে আমি একটু বেশিই ভালবাসি।ওর ফোন পেয়ে
আমার দিন শুরু হয়...নয়তো ঘুম থেকে উঠতেই ইচ্ছে করেনা!আয়েশা এমনভাবে আমার
জীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে যে মনে হয় ওকে ভাবা ছাড়া একটা মুহুর্ত কাটানোও আমার
জন্য অসম্ভব!
.
.
আয়েশার মত মেয়ের আমার জীবনে ঢুকে
পড়ার গল্পটা সাদামাটা।ও আমার বন্ধু হাসানের ছোট বোনের সাথে পড়ত।আমি আবার
সেই লেভেলের বন্ধুপাগল,যখন তখন হাসানদের বাড়িতে গিয়ে উঠতাম।আয়েশা প্রায়ই
ওদের বাড়িতে আসত ওর বোন হাসিনার কাছে।কেন জানি ওকে দেখলেই আমার মন ভালো হয়ে
যেত।হাসিনার সাথে কথা বলার ফাঁকে ও আমাকে আড়চোখে দেখত তাই প্রায়ই ওর সাথে
চোখাচোখি হত।কখনো বা ওর দিকে তাকাতে গিয়ে ধরা পড়ে আমি বোকার মত হাসতাম,আর
আয়েশা মুচকি হাসত যেন চোর পাকড়েছে!ওর সেই হাসি দেখে আমার বুকের ভেতর তোলপাড়
হয়ে যেত....সে এক অন্যরকম অনুভুতি।সেবার আয়েশা ম্যাট্রিকে গোল্ডেন এ-প্লাস
পেল।গ্রামের স্কুল থেকে এত ভালো রেজাল্ট করাটা চাট্টিখানি কথা না,যদিও
আমাদের পাড়াগাঁ এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত,মানুষের আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে
ভালো হওয়ায় গ্রাম এখন প্রায় শহর হয়ে গেছে।তো আয়েশার আগে আমাদের স্কুল থেকে
ম্যাট্রিকে এত ভালো কেউ করেনি,আমি যে সেবার কি পরিমাণ খুশি হয়েছিলাম তা
বলার মত না।খুশিতে বন্ধুদের মিষ্টিও খাইয়েছিলাম।কিন্তু যার জন্য এতকিছু তাকে তো এখনো মনের কথা বলাই হয়নি!
.
সাতপাঁচ না ভেবে পুরোপুরি আবেগের বশেই ওকে প্রেম নিবেদন করে ফেলি। আমার
সেই মজনুমার্কা চিঠি পড়ে আয়েশা তো ভীষন অবাক!ভদ্র ছেলে হিসেবে এলাকায়
নামডাক ছিল,দেখতেও খারাপ ছিলাম না,তাই বোধহয় আয়েশাও আমার আবেগে সাড়া
দিয়েছিল!প্রথম একবছর চিঠি দিয়েই প্রেম করেছি,ডাকপিয়ন হাসিনা।কয়েকমাস আগে
ওকে অনেক বলে মোবাইল কিনতে রাজি করিয়েছি।এখন সারাদিন কথা হলেও মনে হয় আগের
সেই চিঠিই ভালো ছিল।ফোনে কত কি বলা যায়না,চিঠিতেই সব বলা যায়।
.
.
মনটা ভালো না।আয়েশাকে নিয়ে অনেক চিন্তা হচ্ছে।ইদানিং ও প্রায়ই অসুস্থ
থাকে।ডাক্তার দেখাতে বললেও গুরুত্ব দেয়না।নিজের প্রতি কোনো খেয়ালই নেই
ওর,সারাক্ষন অন্যদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে।আয়েশার বাবা দেশের বাইরে থাকে।তিন
ভাইবোনের মধ্যে ও-ই বড়।তাই সংসারের অনেক কিছুই ওকে দেখতে হয়।ও ক্লাস নাইন
থেকে টিউশনি করে নিজের খরচ চালায়।যদিও ওদের অবস্থা তত খারাপ নয়,তবু আয়েশা
নিজের খরচ নিজে চালাতে ভালবাসে......এমন
কি আমি যদি কখনো টাকাপয়সার টানাটানিতে পরে যাই,তো আয়শার কাছে চাইলেই
পাই।আমি প্রথম প্রথম ওর কাছ থেকে টাকা নিতে ইতস্তত করতাম।কিন্তু ও
বলে,তোমার বিপদের সময় যদি পাশে দাঁড়াতে নাই পারলাম,তবে আর ভালবাসা কিসের?
আমি আবার অনেকটাই বেহিসেবি,যা আয়েশার একেবারেই অপছন্দ।বাবা- মার একটাই ছেলে
হওয়ায় রাগটাও একটু বেশি,কিন্তু আয়েশা আমার জীবনে আসার পর আমাকে পুরোপুরি
বদলে দিয়েছে।ওর পরিবারও ওর উপর অনেকটা নির্ভরশীল।কিন্তু
সবার খেয়াল রাখতে গিয়ে ও নিজের কথাই ভুলে যায়।আজ ডাক্তার বলেছে ওর নাকি
রক্তশূন্যতা। ঠিকঠাক ঔষধ খেলে সুস্থ হয়ে যাবে তবু আমার ভয় হচ্ছে।গত মাসেই
মা- বাবাকে পাঠিয়েছিলাম ওদের বাড়ি।গ্রামের কলেজ থেকে ডিগ্রি পাশ করে আর কি
চাকরি করব,এমনিতেও আমার অন্যের গোলামি করার ইচ্ছা নেই।তাই বাজারে একটা বড়
কাপড়ের দোকান দিয়েছি।ভয়ে ছিলাম আয়েশার পরিবার রাজি হবে কিনা,কারন ওর জন্য
আরো অনেক ভালো ভালো বিয়ের প্রস্তাবও ওনারা ফিরিয়ে দিত।ভাগ্য বলে একটা কথা
আছে না!ওটাই আমাদের পক্ষে ছিল.....কেমন করে যেন ওরা আমাদের প্রস্তাবে রাজি
হয়ে গেল! ছোটবেলা থেকেই দুই পরিবার দুজনকে দেখে আসছে তাই কেউই তেমন আপত্তি
করেনি।২মাস পর আয়েশার বাবা বিদেশ থেকে আসলে বিয়ে হবে চূড়ান্ত হল।আর আমি ওকে
আবার নতুন করে ভালবাসতে শুরু করলাম....সারাক্ষন ওকে নিয়ে কল্পনায় ডুবে থাকি আর নিজের অল্প আয় দিয়েই ওর জন্য মনের মাধুরী মিশিয়ে ঘর সাজাই!
.
.
আজ দুপুরে খেতে এসে শুনি আয়েশা এসেছিল!আমার ছোট বোন জোর করে নিয়ে এসেছে
গয়নার ডিজাইন পছন্দ করতে।আমার ঘরে ঢুকে টেবিলের উপর একটা চিরকুট পেলাম। "এই
হাঁদারাম! ঘরটাতো বেশ সুন্দর সাজিয়েছ! আয়না,আলমারি,জানলার
পর্দা,এতসব কবে কিনলে?কখনো বলনি তো? চুড়িগুলো আমার খুব পছন্দ হয়েছে।আর
সেলফের সবগুলোই তো আমার প্রিয় বই! রকিং চেয়ার যে আমার ভালো লাগে এটা কি
তোমাকে বলেছিলাম?সদর থেকে আনিয়েছ,না? তুমি কি বলতো?শুধু শুধু কতগুলো টাকা
খরচ।তবে আমি খুব খুশি হয়েছি....তোমার সমঝদারি দেখে! শোনো বারান্দায় কয়েকটা
লতানো ফুলের গাছ লাগবে আর আলনাটা একটু গুছিয়ে রাখবে.....আচ্ছা
থাক,আমি এসেই না হয় গুছাবো! ইতি তোমার হাঁদিরাম!" . চিঠি পড়ে নিজের মনেই
হাসলাম। সারপ্রাইজটা আর দেয়া হলনা!রাতে কথা বলার সময় আয়েশা বলল ওর শরীর
খারাপ লাগছে।তাই কথা না বাড়িয়ে ওকে ঘুমাতে বললাম।পরদিন বেলা গড়িয়ে গেল
কিন্তু আয়েশার ফোন এলোনা।দোকানে ব্যস্ত থাকায় প্রথমদিকে গুরুত্ব দেইনি
কিন্তু দুপুর হয়ে এল,ওকে ফোন দিলাম,ধরছে না।ওর মাকে ফোন দিতে উনি যা বললেন
তাতে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল.......আমার আয়েশার দুটো কিডনিই ড্যামেজড!সদরের
ডাক্তার এটা ধরতে পারেনি,কাল রাতে হঠাৎ ও বেশি অসুস্থ হয়ে পরে,শ্বাস নিতে
পারছিল না।সদরের হাসপাতালে রাখেনি,ঢাকা ট্রান্সফার করে দিয়েছে।সেই রাতেই ওর
মা-চাচা ওকে ঢাকা নিয়ে গেছে,সেখানে ডাক্তার বলেছে অনেক দেরি হয়ে গেছে,আর
কোন আশা নেই।
.
.
এরপরের দিনগুলো আমার জীবনে সবচেয়ে
কঠিন সময়.....ভাবিনি জীবন কোনোদিন এভাবে মোড় নেবে।আমি ঢাকা চলে আসি,আয়েশাও
ঢাকায় ওর খালার বাসায় উঠে।অন্তত একটা কিডনির ডোনার পেতে সম্ভাব্য সব জায়গায়
ধর্ণা দিতে থাকি সবাই। আমি সারাক্ষন ওর সাথে ফোনে কথা বলি......কিছুক্ষন
কথা না হলে মনে হয় ও হারিয়ে যাচ্ছে আমার কাছ থেকে। আয়েশা শুধু কাঁদে,ওর
পরিবারকে দেখে রাখতে বলে।ওর মা আর ছোট ভাইবোনগুলোর মুখের দিকে তাকানো
যায়না।সাত দিন পর একটা কিডনির জন্য ডোনারের সন্ধান পাওয়া গেল।আমি সে
উদ্দেশ্যেই বের হয়েছিলাম তবে বেশিদূর যেতে পারিনি।মাঝপথেই ফোন আসে,আমার
আয়েশা সত্যিই হারিয়ে গেছে,চলে গেছে আমাকে ছেড়ে......
* * *
আয়েশার সাথে শেষ কি কথা হয়েছিল ভুলে গেছি।আমার এমনই ভাগ্য যে ওকে আমি শেষ
দেখাও দেখতে পারিনি। সেদিন খবরটা শোনার পরপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি,পুরো
তিনদিন পর আমার জ্ঞান ফিরে।ওকে হারিয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম,সারাদিন
ওর কবরের পাশে বসে থাকতাম।একসময় আমাকে মেন্টাল এসাইলামে ভর্তি করা
হয়।একবছর পর সুস্থ হয়ে কালই বাড়ি ফিরেছি।সবার সামনে আমাকে ভাল থাকার ভান
করতে হয়,কিন্তু আমি জানি আয়েশাকে হারিয়ে আমি কোনোদিন স্বাভাবিক হতে পারব
না। আমি প্রতি মুহূর্তে ভাবি এটা যদি আমার কোনো দুঃস্বপ্ন হত।যদি ঘুম ভেঙে
দেখতাম আয়েশা আমার পাশেই ঘুমিয়ে আছে!কিন্তু বাস্তবতা আমাকে ছাড়েনা।আমার রুম
থেকে আয়েশার জন্য রাখা সব চিহ্ন সরিয়ে ফেলা হয়েছে।হয়তো ও চলে যাবে বলেই
সেদিন এসেছিল,সব দেখে গিয়েছিল।ও তো সবার ভালবাসায় পূর্ণ হয়ে চলে গেল আমাকে
নিঃস্ব করে। আমি এখন ফোনে কথা বলতে পারিনা। ফোন কানে দিলে মনে হয় কেউ আমাকে
বলছে,তুমি এত বেহিসেবি কেন?.....তুমি আমাকে এত ভালবাস কেন?.....হারিয়ে
ফেললে সহ্য করতে পারবে তো?....এত ভালবেসেছিলাম বলেই বুঝি ছেড়ে চলে
গেলে!তোমার কথাগুলো এখনো কানে বাজে আর আমার বুকের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রনায়
দুমড়ে-মুচড়ে যায়..... .
.
লেখা-রাজকন্যা মায়াবতী
No comments:
Write comments